মার্কিন উচ্চ শুল্কজনিত অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বিদেশী বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ভিয়েতনাম। বিশেষ করে দেশটির উৎপাদন ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিয়েল এস্টেট খাত বিদেশীদের মনোযোগ ধরে রেখেছে। এ প্রবণতার পেছনে কাজ করছে একাধিক বিষয়। যেমন ভিয়েতনাম সরকারের নীতিগত প্রণোদনা, উন্নত মানের অবকাঠামো এবং চীন থেকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন স্থানান্তরের প্রেক্ষাপটে দেশটির কৌশলগত অবস্থান। খবর নিক্কেই এশিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভিয়েতনামের। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি পৌঁছে ১৩ হাজার ৬৬০ কোটি ডলারে, যা ভিয়েতনামের মোট জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ। গত এপ্রিলে হ্যানয়ের ওপর ৪৬ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ঘোষণা করে ওয়াশিংটন। এ ঘোষণা ভিয়েতনামের উৎপাদন খাতে ধাক্কা দিলেও মে মাসে ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) ৪৫ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ৪৯ দশমিক ৮-এ পৌঁছে, যা স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশের ইঙ্গিত বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের।
উৎপাদন ও রিয়েল এস্টেট দুই খাতই ভিয়েতনামে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহে শীর্ষে রয়েছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত জানুয়ারি-এপ্রিলে নতুনভাবে অনুমোদিত বৈদেশিক বিনিয়োগ পৌঁছেছে ১ হাজার ৩৮২ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৮৯০ কোটি ডলার পেয়েছে উৎপাদন খাত। ২৮৩ কোটি ডলার গেছে রিয়েল এস্টেটে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ভিয়েতনামের শিল্প ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট খাতগুলো ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ হারে সম্প্রসারণ হয়েছে, যা দেশটির জিডিপিতে ৪০ শতাংশের বেশি অবদান রেখেছে।
গত মাসের শেষদিকে অনুষ্ঠিত হয় ভিয়েতনাম ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কস ডেভেলপমেন্ট ফোরাম। সেখানে ভিয়েতনাম ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ার নুগুয়েন থি জুং জানান, দেশটির শিল্প পার্কে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ কেন্দ্রীয় অঞ্চলে জমির ঘাটতি থাকায় অন্য প্রদেশগুলোর দিকে নজর বিনিয়োগকারীদের। তবে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। এর মধ্যে চারটি হলো জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া, অভিন্ন অবকাঠামো পরিকল্পনার অভাব, জমি অধিগ্রহণ সমস্যা ও আন্তঃআঞ্চলিক দুর্বল সংযোগ।
ফোরামে চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের ভূমি ব্যবস্থাপনার পার্থক্য তুলে ধরেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান বিডব্লিউ ইন্ডাস্ট্রিয়ালের সিইও ল্যান্স লি। চীনে দ্রুত ও কম খরচে জমি সরবরাহ করে সরকার। কিন্তু ভিয়েতনামে জমি বিক্রি করে প্রথম শ্রেণীর ডেভেলপাররা, যার কারণে দাম বেশি ও অধিগ্রহণে সময় লাগে।
ল্যান্স লি জানান, অনেক সময় ভিয়েতনামের শিল্পাঞ্চলে জমির জন্য চীনের মূল ভূখণ্ডের তুলনায় বেশি দাম দিতে হয়। এখানে বার্ষিক ভাড়া প্রায় ৬ শতাংশ হারে বাড়ছে।
বর্তমানে ভিয়েতনামে ৪১৬টি শিল্প পার্ক রয়েছে, যেগুলোর মোট আয়তন ১ কোটি ২৯ লাখ হেক্টর। বিশ্বব্যাপী উৎপাদন কেন্দ্র স্থানান্তরকে স্বাগত জানাতে দেশটির সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে আরো ২২১টি নতুন পার্ক তৈরি, ৭৬টি সম্প্রসারণ এবং ২২টি পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা করছে।
ওয়ারবার্গ পিনকাস ও বেকামেক্স আইডিসির যৌথ উদ্যোগে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিডব্লিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল। কোম্পানিটি বর্তমানে ১২টি প্রদেশে অর্ধশতাধিক প্রকল্প পরিচালনা করছে। যার তত্ত্বাবধানে রয়েছে এক কোটি বর্গমিটার জমি ও ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ।
ল্যান্স লি সতর্ক করেন, ভিয়েতনামে উৎপাদন সস্তা অনেকের মাঝে থাকা এ ধারণা ভুল। অনেক প্রতিষ্ঠানের হার্ডওয়্যার খরচ বেশি, শ্রম দক্ষতা কম এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
সঙ্গে যোগ করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ, কভিড-১৯ মহামারী থেকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যে বাজার কাঠামো অনেক বদলে গেছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানান্তরের ধরন ও গতি পরিবর্তন হয়েছে।
শ্রম খরচ নিয়ে লি বলেন, ‘তিন মাসের প্রশিক্ষণের পর একজন ভিয়েতনামি কর্মীর দক্ষতা চীনা কর্মীর ৮০ শতাংশের বেশি হতে পারে, অথচ বেতন ৮০ শতাংশের কম। শুধু উন্নত ব্যবস্থাপনা ও অটোমেশনের মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠানই এ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।’
কভিড-১৯ মহামারী একটি মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। শুরুতে শুধু চূড়ান্ত পণ্যের উৎপাদনকারীরা চীন ছেড়ে যায়। কিন্তু পরে বৈশ্বিক লজিস্টিকস ধসে পড়লে দ্রুত উৎপাদন চেইন তৈরির প্রয়োজন হয়, ফলে শিল্পের স্থানীয়করণের চাহিদা বাড়ে। এছাড়া উৎপাদনের উৎস দেশ নির্ধারণে এখন ‘রুলস অব অরিজিন’ (উৎপত্তি বিধি) আরো কঠোর হয়ে উঠেছে। অনেক দেশ এখন রফতানি পণ্যে অধিক স্থানীয় উপাদান চাচ্ছে।
চীন কভিড বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার পর ২০২২ সালের শেষ দিকে কোম্পানি স্থানান্তরের আরেকটি ঢেউ শুরু হয়। তবে এটি আকস্মিক কিছু নয়। বরং পূর্বপরিকল্পিত অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় হয়ে এসেছিল তখন। ২০২৩ সালের পর থেকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কারণে বিদেশে যাওয়া অব্যাহত রেখেছে। সেই সুযোগ সামনে রেখে বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ নিচ্ছে ভিয়েতনাম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু হতাশাজনক অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদনের দিক থেকে ভিয়েতনাম এখনো এগিয়ে। কারণ এখানকার কর্মীরা কনফুসীয় মূল্যবোধে প্রভাবিত, ফিলিপাইনের চেয়ে বেশি হলেও শ্রম ব্যয় থাইল্যান্ডের চেয়ে কম। এছাড়া সরকারি দক্ষতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাস্তববাদী কৌশল, উন্মুক্ত নীতি ভিয়েতনামকে বিনিয়োগবান্ধব করেছে। দেশটি ১৭টি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যুগের আগেই গড়পড়তা শুল্ক হার কম ছিল। তবে ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ভিয়েতনামের বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে বলে মত ল্যান্স লির। তিনি আশা করেন, চীনের ওপর মার্কিন শুল্ক দীর্ঘদিন থাকবে। তবে অন্যান্য দেশের ওপর তা ধীরে ধীরে কমানো হতে পারে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে লি মনে করেন, আগামী তিন বছরে চীনা উৎপাদন ব্যবস্থার বিদেশে স্থানান্তর আরো গতি পাবে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা চলমান থাকলে এ স্থানান্তর প্রায় অনিবার্য। যার সুফল পাবে ভিয়েতনাম। তবে দেশটিকে মজুরি ও জমির মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধির প্রবণতা সামলাতে হবে। এছাড়া শ্রমঘন খাতগুলো ধর্মঘট ও শ্রমবিরোধের আশঙ্কার মুখে পড়তে পারে বলেও ল্যান্স লি সতর্ক করেন।